মানিকগঞ্জের ঘিওরে তিন দিনব্যাপী বৈশাখী মেলায় লোকজ ঐদিহ্যের নানা আয়োজনে
মানুষের ঢল নেমেছে। পহেলা বৈশাখে শুরু হওয়া এ মেলা আজ মঙ্গলবার
আনুষ্ঠানিক শেষ হলেও মেলার বিকিকিণি চলে আরো সপ্তাহখানেক পর্যন্ত। ঘিওর
উপজেলার পয়লা ইউনিয়নের বড় কুষ্টিয়া গ্রামের প্রাচীণ বটতলার মাঠে বৈশাখী
মেলা শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে বলে জানান আয়োজকরা। স্থানীয়
গ্রামবাসীর সহযোগিতায় এ মেলা উপলক্ষ্যে আশেপাশের কয়েক গ্রামের মেয়ে-
জামাইদের দাওয়াত করে আনার রেওয়াজ দীর্ঘদিনের।
তিন দিনের বৈশাখী মেলায় লোকজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, মঞ্চে বাউলসংগীত, লোকজ
নৃত্য, পালাগান পরিবেশিত হয়। মেলায় লোকজ ঐতিহ্যের দেড় শতাধিক দোকান
বসেছে। মিষ্টি, তরমুজ, কদমা, খাজা, গজা, মওয়া মুড়কি, বাতাসা, নিমকিসহ
বাহারি লোকজ খাদ্যসামগ্রীর সমাহার।শিশুদের বিনোদনের জন্য আছে নাগরদোলা,
চরকি, ট্রেন, নৌকাসহ নানা আয়োজন।
সরজমিন দেখা যায়, মেলা প্রাঙ্গণে বাদ্যের তালে তালে চলছে লাঠিখেলা, পাতিল
ভাঙা, আগত শিশু মেয়েদের বিস্কুট খেলা, শিশু ছেলেদের মোরগ লড়াই, নারীদের
ভারসাম্য দৌড়, বালিশ খেলা। সেই সাথে যুবদের তৈলাক্ত কলা গাছে বেয়ে ওঠা
প্রতিযোগিতা, ষাটোর্ধ্ব প্রবীণদের মিনি ফুটবল ম্যাচ, চোখ বেঁধে হাঁস ধরা
খেলা, দ্রুত গতির বাই সাইকেল রেস, ধীরগতিতে মটর সাইকেল রেস দেখে মুগ্ধ
হন শত শত দর্শক। পরে প্রতিটি ক্রীড়া ইভেন্টে প্রথম, ২য় ও ৩য় স্থান
অর্জনকারীদের দেয়া হয় পুরষ্কার। মেলায় আগতদের বেশিরভাগই রঙিন পাঞ্জাবি,
ফতুয়া, লুঙি পরে বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নেন। নারী ও কিশোরীদের পরনের ছিল
বাহারি রঙের শাড়ি।
মেলায় ঘুরতে আসা প্রবীণ সাইজুদ্দিন (৭০) বলেন, একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে
এখানে বৈশাখী মেলা বসছে। আমার বাবার মুখে শুনেছি তিঁনিও ছোট বেলায় এই
মেলায় আসতেন। একসময় মেলার আকর্ষণ ছিল পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ, সাপের খেলা ও
বানরের খেলা। এখন আর চোখে পড়ে না।
আয়োজক সদস্য স্থানীয় যুবক রোমিও হোসেন ও নাঈম বলেন, এবারের বৈশাখী মেলায়
নতুন প্রজন্মের কাছে বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐতিহ্য তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া
হয়েছে। মেলায় বিলুপ্ত কিছু গ্রামীণ লোকজ ঐতিহ্য প্রদর্শন করা হয়। এর
মাধ্যমে বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা যেমনটা সম্ভব হবে, তেমনি
বাঙালির কাছে তাঁর নিজস্ব সংস্কৃতি ফিরে আসবে। এটি আমাদের গ্রামের শত
বছরের ঐতিহ্য।
স্থানীয় বড় কুষ্টিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ফিরোজ আলম বাবুর
সভাপতিত্বে ক্রীড়া ও লোকজ প্রতিযোগিতার পুরষ্কার প্রদান করেন, সাংবাদিক
মজিবর রহমান, মেলা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক আব্দুস সেলিম, সদস্য সচিব রেজা
মন্ডল, সমাজ সেবক মাহাববুর রহমান রাজিব, আব্দুল মুত্তালেব, লিটন মন্ডল,
আলাউদ্দীন আলো, আরিফ প্রধানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
মেলা উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব রেজা মন্ডল বলেন, পয়লা বৈশাখের এ উৎসব
প্রমাণ করে বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনার সম্প্রীতির দেশ। উৎসবের
মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলমন্ত্র আগামীর প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে
দিতে আগামিতে আরো বড় পরিসরে এ মেলা ও গ্রামীণ সংষ্কৃতির নানা অনুষঙ্গ
প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে।