November 2, 2026, 2:01 am
শিরোনামঃ
এগ্রোইকোলজির খাদ্যব্যবস্থা ও রাসায়নিক কৃষির প্রভাব পানিতে ডোবে জমি, গাওতায় ফলছে ফসল ঘিওরে জমি উদ্ধারের অভিযানে হামলার অভিযোগ, ভেকু চালক আহত; আটক ১ ঘিওরে শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে গাছের চারা রোপন করেন ছাত্রদল নেতা। আশা শিক্ষা কর্মসূচি হতে প্রাথমিকে বৃত্তি পেলেন আব্দুল্লাহ উমার মানিকগঞ্জে শ্রেষ্ঠ ইউনিয়ন পরিষদ চকমিরপুর, শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রমী গাইডলাইন সেশন সুশাসন ও আধুনিক নগর গড়ার প্রত্যয়ে মানিকগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে মাসুদ পারভেজ নারায়ণগঞ্জে ৭০ বছর দখলে থাকা জমি জোরকরে বে-দখলের অপচেষ্টা। মিথ্যা মামলা থেকে খালাস পেলেন এশিয়ান টেলিভিশনের সাংবাদিক সোহেল রানা খন্দকার এমপি এস. এ. জিন্নাহ কবির–এর এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পেলেন টিপু সুলতান

এগ্রোইকোলজির খাদ্যব্যবস্থা ও রাসায়নিক কৃষির প্রভাব পানিতে ডোবে জমি, গাওতায় ফলছে ফসল

Reporter Name

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ থেকে

জমি আছে, কিন্তু মাটি নেই। চারদিকে পানি, তবু থেমে নেই কৃষি। কচুরিপানা, ধানের খড় আর স্থানীয় জ্ঞান কাজে লাগিয়ে পানির ওপর তৈরি হয়েছে ভাসমান কৃষিক্ষেত্র। মাটির বদলে ‘গাওতা’র বুকে জন্ম নিচ্ছে হলুদ, ঢেঁড়স, বরবটি, দেশি লাউসহ নানা সবজি।

মানিকগঞ্জের জয়নগরের কৃষক আলপনা রানি সরকার সেই ভাসমান কৃষিরই একজন চর্চাকারী। বেসরকারি কৃষি গবেষণা সংস্থা বারসিকের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পানিতে ডুবে থাকা জমিকে তিনি পরিণত করেছেন উৎপাদনের জায়গায়। গত বছর একটি গাওতা থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। এবার তিনটি গাওতা থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয়ের লক্ষ্য তাঁর।

আলপনা রানির এই উদ্যোগ শুধু একজন কৃষকের আয় ও আত্মনির্ভরতার গল্প নয়। এটি প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য উৎপাদনের এক বাস্তব উদাহরণ, যার সঙ্গে মিশে আছে এগ্রোইকোলজি বা প্রতিবেশভিত্তিক কৃষির দর্শন।

প্রকৃতির সঙ্গে কৃষির সহাবস্থান

এগ্রোইকোলজি মানে শুধু রাসায়নিক সার বা কীটনাশন বাদ দেওয়া নয়। এটি কৃষিকে প্রকৃতির একটি অংশ হিসেবে দেখার পদ্ধতি। মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য, কৃষকের জ্ঞান, উৎপাদন খরচ ও বাজারকে একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা এর মূল কথা।

কৃষিতে বৈচিত্র্য, ফসল পর্যায়ক্রম, জৈব সম্পদের পুনর্ব্যবহার, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, কৃষিবনায়ন ও স্থানীয় জাত সংরক্ষণ এর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বেসরকারি কৃষি গবেষণা সংস্থা বারসি এর মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায় বলেন, এগ্রোইকোলজি শুধু একটি চাষপদ্ধতি নয়, এটি স্থানীয় সম্পদ, কৃষকের জ্ঞান ও প্রকৃতির ভারসাম্যকে কাজে লাগিয়ে টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি পদ্ধতি। ভাসমান কৃষি তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।

আলপনা রানির গাওতায় সেই ধারণারই বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়। যে কচুরিপানা জলাশয়ে অনেক সময় সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, সেটিই এখানে কৃষির উপকরণ। ধানের খড় ও অন্যান্য উদ্ভিদ অবশিষ্টাংশও ফিরে আসছে উৎপাদনের চক্রে।

অর্থাৎ “বর্জ্য হয়ে উঠছে সম্পদ, পানি হয়ে উঠছে কৃষিক্ষেত্র।”

বাংলাদেশের ভাসমান কৃষির ঐতিহ্যও নতুন নয়। জলাবদ্ধ ও দীর্ঘদিন পানিতে নিমজ্জিত এলাকায় কচুরিপানা ও উদ্ভিদ অবশিষ্টাংশ দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে চাষাবাদের এই পদ্ধতি বহুদিনের। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা FAO বাংলাদেশের ভাসমান বাগান পদ্ধতিকে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

রাসায়নিক কৃষির প্রয়োজন ও ঝুঁকি

আধুনিক কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশনের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফসলের পুষ্টি সরবরাহ, রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন বাড়াতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে সমস্যা তৈরি হয় অতিরিক্ত, অনিয়ন্ত্রিত বা ভুল ব্যবহারে।

অতিরিক্ত সার মাটির ভারসাম্য ও পানির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি উপকারী পোকা ও অন্যান্য জীবের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগও উঠে এসেছে।

ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন বলেন, রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক কৃষিতে প্রয়োজনীয় হলেও তা অবশ্যই ফসল ও জমির প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে উৎপাদন বজায় রেখেও পরিবেশের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।

তাই সমাধান রাসায়নিক কৃষিকে এক কথায় বাতিল করা নয়। বরং “সঠিক উপকরণ, সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা” নিশ্চিত করা। এগ্রোইকোলজি সেই জায়গাতেই বিকল্প পথ দেখায়।

শুধু ফলন নয়, মাটির স্বাস্থ্যও

একটি জমির সাফল্য শুধু কত মণ ফসল হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। মাটির ভেতরে থাকা অণুজীব, কেঁচো ও অন্যান্য জীবও কৃষির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা জৈব পদার্থ ভাঙে, পুষ্টি পুনঃচক্রায়ন করে এবং মাটির গঠন ও পানি ধারণক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

তাই দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা জরুরি।

ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া, কম্পোস্ট ব্যবহার, ফসলের বৈচিত্র্য এবং প্রয়োজনভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনা মাটির ওপর চাপ কমাতে পারে। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও কিছু ক্ষেত্রে কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ বিষয়ে ঘিওরের রাথুরা গ্রামের কৃষক কবির খান বলেন, কৃষকের কাছে জমির উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি খরচও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমানো এবং মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে পারলে কৃষক দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবেন।

খাদ্যব্যবস্থার হিসাব বদলানোর সময়

দীর্ঘদিন কৃষিতে বড় প্রশ্ন ছিল—“কত বেশি উৎপাদন করা যায়?” এখন প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত।

এই উৎপাদন কতটা টেকসই? মাটির উর্বরতা কতদিন থাকবে? পানির ওপর চাপ কতটা পড়বে? জীববৈচিত্র্য টিকবে তো? কৃষকের হাতে ন্যায্য আয় থাকবে তো? ভোক্তা নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাবেন তো?

কারণ খাদ্যব্যবস্থা শুধু কৃষকের মাঠে শেষ হয় না। বীজ, সার, পানি, উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজার ও ভোক্তার প্লেট—সবকিছু মিলেই একটি খাদ্যব্যবস্থা।

সেখানে এগ্রোইকোলজির গুরুত্ব হলো, উৎপাদনের পাশাপাশি “পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাকে একই কাঠামোয় দেখা।”

বাংলাদেশের জন্য সমাধান কোথায়?

বাংলাদেশের কৃষি একেক এলাকায় একেক রকম। কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও চর, কোথাও নদীভাঙন, কোথাও খরা। তাই সবার জন্য একই কৃষিপদ্ধতি কার্যকর হবে না।

সমাধান হতে পারে “স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে কৃষির অভিযোজন।”

জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান কৃষি, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারে মিশ্র ও আন্তঃফসল চাষ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈব পদার্থের পুনর্ব্যবহার, রাসায়নিক ব্যবহারে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ এবং কৃষি-বনায়নের মতো পদ্ধতিকে আরও গবেষণা ও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

তবে শুধু কৃষককে দায়িত্ব দিলে হবে না। প্রয়োজন কৃষি গবেষণা, মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ, সহজলভ্য প্রযুক্তি, মানসম্মত বীজ, নিরাপদ কৃষি উপকরণ, ন্যায্য বাজার ও উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম।

কৃষকের স্থানীয় জ্ঞানকে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি। কারণ মাঠের সমস্যার অনেক সমাধান কৃষকের অভিজ্ঞতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

শেষ কথা

আলপনা রানির গাওতা হয়তো ছোট একটি কৃষিক্ষেত্র। কিন্তু এর শিক্ষা বড়।

পানি এসেছে, জমি ডুবে গেছে। তবু কৃষি থামেনি। কচুরিপানা হয়েছে উপকরণ, খড় হয়েছে সম্পদ, পানি হয়েছে কৃষিক্ষেত্র আর স্থানীয় জ্ঞান হয়েছে প্রযুক্তি।

এটাই এগ্রোইকোলজির শক্তি—“প্রকৃতিকে জয় নয়, প্রকৃতির সঙ্গে কাজ করে খাদ্য নিরাপদ উৎপাদন।”

তবে ভবিষ্যতের কৃষি শুধু ‘রাসায়নিক বনাম জৈব’ এই দ্বন্দ্বে আটকে থাকলে চলবে না। প্রয়োজন বিজ্ঞান ও স্থানীয় জ্ঞানের সমন্বয়ে এমন কৃষি, যেখানে উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য, পানির নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও কৃষকের আয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

“কৃষিকে টেকসই করতে হলে কৃষককে শুধু বেশি ফলন দিতে বলা নয়, তাকে টেকসইভাবে ফলন দেওয়ার পথও তৈরি করে দিতে হবে।”

আজকের গাওতা তাই শুধু পানির ওপর ভাসমান একটি কৃষিক্ষেত্র নয়। এটি একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত—“কম সম্পদে, স্থানীয় উপকরণে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে কীভাবে আগামী দিনের খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।”

শেষ পর্যন্ত আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন কৃষি—“যেখানে কৃষক বাঁচবেন, মাটি বাঁচবে, পানি বাঁচবে এবং নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা পাবে আগামী প্রজন্ম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা