ভালো নেই গুণী গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীতশিল্পী মনিরুল ইসলাম খোকন। এক
সময়ে তার লেখা গানে সুর দিয়েছেন শেখ সাদী খান, এইচ এম রফিক, ওস্তাদ সুরুয
মিয়া। তার লেখা গানে কন্ঠ দিয়েছেন কনক চাঁপা, শাকিলা জাফর, সুজীত
মোস্তফা, এম এ হামিদ, সামিয়া আক্তার রুনার মতো প্রতিথযশা শিল্পীরা।
পেয়েছেন বাংলাদেশ বেতার, শিল্পকলার জাতীয় সম্মাণনাসহ বহু সার্টিফিকেট।
ছিলেন বিটিভি ও বেতারের প্রথম শ্রেণীর তালিকাভূক্ত শিল্পী। সান্নিধ্যে
ছিলেন হাসান মতিউর রহমান ও বাউল গীতি শিল্পী কিরণ চন্দ্র রায়ের। খোকনের
নিজের সুরেলা কন্ঠেও মানুষ মুগ্ধ হলেও আজ তিনি নিস্তেজ। কণ্ঠে নেই সেই
সুমধুর সুর – শক্তি। নানা রোগে ভুগে এখন শয্যাশায়ী মানিকগঞ্জের এই
শিল্পী। অর্থের অভাবে চিকিৎসাটুকু পর্যন্ত করাতে পারছেন না। তিলে তিলে
ভুগছেন মরণ যন্ত্রণায়।
মনিরুল ইসলাম খোকনের লেখা – কনক চাঁপার গাওয়া ‘তুমি ভালোই করেছো আমাকে
ভালো না বেসে’ শাকিলা জাফরের স্বপ্ন ছিল শিরোনামের গানগুলো এখনোও
সঙ্গীতপ্রিয় মানুষের মুখে মুখে। গতকাল মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার
জয়মন্টপ ইউনিয়নের খান বানিয়ারা গ্রামে খোকনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়
পরিবার পরিজন নিয়ে নিদারুন মানবেতর জীবন যাপনের চিত্র। তার বাবার নাম
মৃত ফজলুল হক। ব্যক্তিগত জীবনে ২ সন্তানের জনক। গ্রামের বাড়িতেই
স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। প্রতিটা মূহুর্ত তাকে কাটাতে
হচ্ছে নিজ ঘরের শয়ন কক্ষে।
আধুনিক বাংলা গানের এ গুণী শিল্পী ১৯৭৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়ার
পর থেকে কোন রকম গানের টিউশনি করে চালাতেন তার সংসার। মাঝে-মধ্যে বেতার ও
বিটিভিতে ডাক পরলে গান রেকর্ডের পর পেতেন সামান্য সম্মানী। জেলা শিল্পকলা
একাডেমী থেকে বছরে পান সামান্য ভাতা। ৬ মাস আগে হার্ট এ্যাটাকে তিনি
শয্যাশায়ী। সম্প্রতি উপজেলা শিল্পকলা একাডেমী শিক্ষক পদ থেকে তাকে বাদ
দেয়া হয়েছে। বর্তমানে এ অবস্থায় উপার্জনের নেই কোন বাড়তি আয়ের উৎস।
খোকন বলেন, ১২০০ গান লিখেছি। নিজের লেখা গানগুলো থেকে সুর করেছি ১২০টি।
আমি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী। সেই বাল্যকাল থেকে
সংগীতের হাতেখড়ি। একসময় আমার নাম ডাক ছিল। ছিল কদর, সম্মান। আজ
পুঙ্গু হয়ে ঘরে শুয়ে থাকি।
কেউ খোঁজ খবর নেয় না। অর্থাভাবে সংসার চলে না কিভাবে চিকিৎসা করাবো।
আধুনিক বাংলা গান, চলচিত্রের প্লেব্যাক ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও
সাম্প্রতিক বিষয়ের উপর বেশ কিছু গান বিভিন্ন বেসরকারী চ্যানেলে প্রচার
হয়। খোকনকে সর্বশেষ ২০১৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশ বেতার বা টেলিভিশনে
গান রেকর্ডিং এর জন্য আর ডাকা হয়নি। এরপরেই তিনি হার্ট এ্যাটাক করেন। ফলে
আর কোন অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনের সুযোগ পাচ্ছেন না অসুস্থ মনিরুল ইসলাম
খোকন। ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ৬ মাস আগে জাতীয়
হৃদরোগ ইনস্টিটিউট পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর হার্ট পাম করে না বলে চিকিৎসকরা
জানান। হার্টে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সিআরটি (পেশ মেকার) মেশিন
স্থাপন করতে হবে। এতে চিকিৎসকের ভাষ্যানুযায়ী খরচ হবে ৮ থেকে ১০ লাখ
টাকা।
চিকিৎসার ব্যয়ের কথা শুনে তার পরিবারটিতে নেমে এসেছে অনামিশার ঘোর
অন্ধকার। খোকনের স্ত্রী সুফিয়া আক্তার ঝর্ণা বলেন, আশে-পাশে বিভিন্ন বাউল
গানের অনুষ্ঠানে দেখা যায় শিল্পীর উপর টাকা ছিটাতে। অথচ টাকার অভাবে একজন
শিল্পীকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হচ্ছে। চিকিৎসা তো দূরের কথা ওষুধ কেনার
টাকাও নেই। কখন যেন নিভে যায় জীবন প্রদীপ। তিনি স্বামীর চিকিৎসার জন্য
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা কামনা করছেন।
স্থানীয় জয়মন্টপ ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ শাহাদৎ হোসেন বলেন, শিল্পী মনিরুল
ইসলাম খোকন আমাদের দেশের সম্পদ। উন্নত চিকিৎসা না হওয়ায় দিনদিন তার
শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছে। তার চিকিৎসায় আমি ব্যক্তিগতভাবে
যতটুকু সম্ভব সহায়তা করবো। তার চিকিৎসার সাহায্যার্থে দেশের সংষ্কৃতি
অঙ্গনেরর সংশ্লিষ্টদের এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
মানিকগঞ্জের প্রতিভাবান নাট্যকার শাকিল আহমেদ সনেট বলেন, মনিরুল ইসলাম
খোকন মানিকগঞ্জ সহ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একজন প্রতিভাবান
সংগীতজ্ঞ। যে যার সারাটি জীবন ব্যয় করেছে সংস্কৃতিক জাগরণের জন্য।কিন্তু
অর্থনৈতিক অনটনের জন্য আজ তার শারীরিক অবস্থা খুবই করুণ। এই গুণী জনের
জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের সহায়তা করা উচিত।
মানিকগঞ্জ জেলা কালচারাল অফিসার সেলিনা সাঈয়েদা সুলতানা আক্তার বলেন,
খোকন মানিকগঞ্জ জেলার একজন গুণী শিল্পী এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমি
থেকে কন্ঠসংগীতে সম্মাননা পদক প্রাপ্ত শিল্পী। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ
অসুস্থতাজনিত কারনে সংস্কৃতি চর্চা করতে পারছেন না। মানিকগঞ্জ
জেলার সংস্কৃতি বিকাশে তার অবদানকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাঁর
চিকিৎসা প্রয়োজন।