মোঃ শরিফুল ইসলাম মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
সাপের কামড় এখন মানিকগঞ্জের মানুষের জীবনে এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সাপে কাটার পর যে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ অ্যান্টিভেনম প্রয়োজন, তা জেলার কোনো সরকারি হাসপাতালে সঠিকভাবে মজুত নেই। ফলে দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ না পেয়ে একের পর এক রোগী মারা যাচ্ছেন বিনা চিকিৎসায়। এরই সর্বশেষ উদাহরণ ঘিওরের ছয় বছরের শিশু মুন্নি আক্তারের মর্মান্তিক মৃত্যু।
গত বুধবার (৮জুলাই) সন্ধ্যায় মুন্নি আক্তারকে সাপে কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই স্বজনরা তাকে দ্রুত মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম নেই। পরে তাকে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানেও একই অবস্থা—অ্যান্টিভেনম মজুত নেই। বাধ্য হয়ে স্বজনরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই নয়াডিঙ্গী এলাকায় বাবার বুকে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায় ছোট্ট মুন্নি।
শিশু মুন্নির বাবা সাগর বিশ্বাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, টিকার (অ্যান্টিভেনম) অভাবে আমার মেয়েটা আমার বুকে মরে গেল। আমার মতো পোড়া কপাল আর কোনো বাবার যেন না হয়। আমার মেয়ের মৃত্যু যেন সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—এই দেশে সাধারণ মানুষের জীবন কতটা মূল্যহীন।
মুন্নির চাচা মো. এরশাদ বলেন, সদর হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও মুন্নির জ্ঞান ছিল। মেডিকেল কলেজে নেওয়ার পরও সে বেঁচে ছিল। যদি অ্যান্টিভেনম থাকত, হয়তো মেয়েটাকে বাঁচানো যেত। এটা শুধু আমাদের পরিবারের ক্ষতি নয়—এটা পুরো জেলার মানুষের জন্য ভয়াবহ বার্তা।
মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন বলেন, আমরা অনেক আগেই অ্যান্টিভেনমের চাহিদা পাঠিয়েছি, কিন্তু এখনও সরবরাহ আসেনি। সাধারণত আমরা সাপে কাটা রোগীদের উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা দিই। শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন, জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও গ্রামে সাপের কামড় একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হলেও বছরের পর বছর অ্যান্টিভেনমের এমন সংকট কেন? অ্যান্টিভেনম না থাকায় জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক, খেতমজুর, জেলে ও গ্রামের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। সাপে কামড়ালে দ্রুত প্রতিষেধক না পেলে ৩০ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। অথচ জেলার কোনো সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম নেই।
সচেতন মহল বলছে, এভাবে অ্যান্টিভেনমের সংকট চলতে থাকলে আরও কত বাবা-মাকে মুন্নির বাবার মতো বুকফাটা কান্না কাঁদতে হবে, তা বলা কঠিন। তাই দ্রুত অ্যান্টিভেনম সরবরাহ এবং প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত মজুদের দাবি জানিয়েছেন জেলার সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিকরা।